চ্যাম্পিয়নদের প্রত্যাবর্তন, এবার স্পেনের সামনে পর্তুগালের কঠিন পরীক্ষা

চ্যাম্পিয়নদের প্রত্যাবর্তন, এবার স্পেনের সামনে পর্তুগালের কঠিন পরীক্ষা

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল স্পেন। তবে প্রথম ম্যাচেই কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত ড্রয়ে কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন কি আগের সেই ছন্দ ধরে রাখতে পারবে? কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সংশয়ের জবাব দিয়েছে ‘লা রোজা’। টানা দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে শেষ বত্রিশেও সহজ জয় তুলে নিয়ে এখন শেষ ষোলোর লড়াইয়ে পৌঁছে গেছে স্পেন। সামনে তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের আরেক পরাশক্তি পর্তুগাল।

বাংলাদেশ সময় ৭ জুলাই রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই ম্যাচ। দুই প্রতিবেশী দেশের এই লড়াইকে ইতোমধ্যেই শেষ ষোলোর অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে দেখছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।

শুরুতে হোঁচট, এরপর দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে ড্র করে হতাশ করেছিল স্পেন। ম্যাচজুড়ে বলের দখল ও সুযোগ তৈরি করলেও জয়ের দেখা পায়নি তারা। সেই ফলাফলের পর স্পেনের শিরোপা সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।

তবে দ্বিতীয় ম্যাচ থেকেই বদলে যায় দৃশ্যপট। সৌদি আরবের বিপক্ষে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ৪-০ গোলের বড় জয় তুলে নেয় স্পেন। এরপর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শক্তিশালী উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে ‘এইচ’ গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে তারা।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে একতরফা আধিপত্য

শেষ বত্রিশে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্পেন। যদিও প্রথম ২০ মিনিট কিছুটা সতর্ক ফুটবল খেলেছিল তারা, এরপর একের পর এক আক্রমণে চাপে ফেলে প্রতিপক্ষকে।

মিকেল ওইয়ারসাবাল দুই গোল করে ম্যাচের নায়ক হন। আরেকটি গোল করেন ডানপ্রান্তের ডিফেন্ডার পেদ্রো পররো। ৩-০ গোলের এই জয় শুধু স্কোরলাইনেই নয়, পরিসংখ্যানেও ছিল স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রতিফলন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, পুরো ম্যাচে অস্ট্রিয়া একটি শটও স্পেনের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে নিতে পারেনি। শক্তিশালী রক্ষণ, নিখুঁত পাসিং এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে রাখে দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।

আবারও ভয়ঙ্কর স্পেন

স্পেনের সাফল্যের অন্যতম কারণ তাদের ঐতিহ্যবাহী বল দখলে রেখে খেলার কৌশলে ফিরে আসা। মাঝমাঠে দ্রুত পাস আদান-প্রদান, দুই উইং দিয়ে আক্রমণ এবং সুযোগ তৈরি করার ধারাবাহিকতা আবারও দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ করে লামিন ইয়ামালের চোট কাটিয়ে ফেরা দলকে আরও শক্তিশালী করেছে। নিকো উইলিয়ামসও ধীরে ধীরে নিজের সেরা ছন্দ ফিরে পাচ্ছেন। তাদের গতি ও ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণে বড় চাপ তৈরি করছে।

এদিকে মিকেল ওইয়ারসাবাল এখন পর্যন্ত চার গোল করে দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এছাড়া লামিন ইয়ামাল, পেদ্রো পররো এবং অ্যালেক্স বায়েনা একটি করে গোল করেছেন।
অপরাজিত স্পেন

স্পেন বর্তমানে টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত। এই সময়ের মধ্যে তারা ইউরোপের বড় বড় দলকে হারিয়েছে এবং ২০২৪ সালে রেকর্ড চতুর্থবারের মতো ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে।

দলের আত্মবিশ্বাসও এখন তুঙ্গে। খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয়, বেঞ্চের গভীরতা এবং কৌশলগত বৈচিত্র্য স্পেনকে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

স্প্যানিশ গণমাধ্যমের উচ্ছ্বাস

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দাপুটে জয়ের পর স্পেনের সংবাদমাধ্যমেও দেখা গেছে উচ্ছ্বাস।

মাদ্রিদভিত্তিক দৈনিক এএস শিরোনাম করেছে— ‘চ্যাম্পিয়নরা ফিরে এসেছে’ এবং ‘প্রতিশ্রুত স্পেন’

অন্য জনপ্রিয় ক্রীড়া দৈনিক মার্কা লিখেছে— ‘লস অ্যাঞ্জেলেসে ছিল শো-টাইম’

আর জাতীয় দৈনিক এল পাইস বলেছে— ‘স্পেন তার জাদু ফিরে পেয়েছে’

এসব শিরোনামই স্পেনের বর্তমান পারফরম্যান্স নিয়ে দেশটির মানুষের প্রত্যাশা ও উচ্ছ্বাসের প্রতিফলন।

সামনে কঠিন প্রতিপক্ষ পর্তুগাল

তবে শেষ ষোলোর ম্যাচ মোটেও সহজ হবে না স্পেনের জন্য। প্রতিপক্ষ পর্তুগালও ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল।

গত বছর উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল। সেই পরাজয়ের
স্মৃতি এখনও স্পেনের জন্য তিক্ত।

যদিও চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি পর্তুগাল। দলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, রাফায়েল লেয়াও, বের্নার্দো সিলভাদের মতো তারকা থাকলেও আক্রমণে ধারাবাহিকতার অভাব এবং খেলোয়াড়দের বোঝাপড়ার ঘাটতি চোখে পড়েছে।

ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসী পর্তুগাল

শেষ বত্রিশে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ে ২-১ গোলের জয় তুলে নেয় পর্তুগাল। দলের হয়ে গোল করেন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং মাতিয়াস রামোস।

এই জয় তাদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে স্পেনের বিপক্ষে নতুন উদ্যম নিয়েই মাঠে নামবে রোবের্তো মার্তিনেজের দল।

চোখ থাকবে ইয়ামাল-রোনালদো দ্বৈরথে

ম্যাচটির অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল ও অভিজ্ঞ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উপস্থিতি। একদিকে ভবিষ্যতের ফুটবলের অন্যতম বড় নাম ইয়ামাল, অন্যদিকে পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী রোনালদো—দুই প্রজন্মের এই লড়াইও বাড়তি উত্তেজনা যোগ করবে
বর্তমান ফর্ম, দলীয় সমন্বয় এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের বিচারে স্পেন কিছুটা এগিয়ে থাকলেও নকআউট পর্বে অতীতের পরিসংখ্যান খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। পর্তুগালের তারকাবহুল দল যেকোনো সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাই ডালাসে দুই ইউরোপিয়ান পরাশক্তির এই মহারণে জমজমাট এক লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কার হাতে উঠবে, তার উত্তর মিলবে ৯০ মিনিট কিংবা প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকারের লড়াই শেষে।